তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত

১,০৮৭

রমজান হলো মুসলিম ধর্মপ্রাণ উম্মাহর জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এক অশেষ রহমাত ও রকমতময় একটি মাস। এই মাসে মুসলমানরা সিয়াম সাধনা বা রোজা পালনের মাধ্যমে মহাল আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করে থাকেন। সিয়াম বা রোজা পালন ছাড়াও বেশ কিছু ইবাদত বা বন্দেগী রয়েছে যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ বা খুশি অনেকটা তরান্বিত হয়। তার মধ্যে একটি হলো তারাবি বা তরাবির নামাজ। এটি মূলত ইশার নামজের পর দুই রাকাত দুই রাকাত করে সর্বনিম্ন আট হতে ২০ বা তারও বেশি রাকাতে আদায় করা হয়ে থাকে যা বিতর ও তাহাজ্জুদ কিংবা কিয়মুল লাইলের পূর্বে সম্পন্ন করতে হয়। তারাবি বা তারাবির নামাজ পালনের নিয়ম ও সংখ্যা নিয়ে হাদিসের ভিন্নতা থাকায় এবং মতের পার্থক্য থাকায় এর পালনের নিয়ম ও সংখ্যার তারতম্য দেখা যায়। পার্থক্য দেখা যায় তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত নিয়েও।

সংখ্যা কিংবা পালনের ব্যতিক্রম থাকলেও এই নামাজ যে একটি বরকতময় ও নেয়ামত তা নিয়ে কোনও মতপার্থক্য নেই। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) তার জীবদ্দশায় যে কয়টি রমজান পেয়েছেন তার সবকটিতেই তিনি বরকতময় এই সালাত বা তরাবি নামাজ আদায় করেছেন। যদিও তা পালনে ছিল সংখ্যার কম/বেশি। তারাবি নামাজ নিয়ে একটি হাদিস যা না বললেই নয়

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রাতের (তারাবি ) নামাজ ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে পড়বে, তার জীবনের আগের সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ সুবহানাল্লাহ!

তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত

২০২২ সালের রমজান বা রোজ কবে শুরু হবে বা কোন মাসের কত তারিখে হবে তা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্ব শেষ। 2022 সালের ৩রা এপ্রিল বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের দেশগুলোতে রমজান ২০২২ পালন শুরু হবে। তবে, পশ্চিমা ও মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে ২রা এপ্রিল হতে শুরু হচ্ছে এবারের রমজান বা রোজা। রোজা শুরু হলে কিংবা শুরুর প্রাক্কালে আমাদের দেশের মুসলমানদের মধ্যে একটি রেজওয়া বা প্রথা দেখা যায় তারা আলেম ওলামা বা ইমাম সাহেবদের দারস্থ্য হয়ে জানার চেষ্টা করেন তারাবির নামাজ আদায়ের সঠিক নিয়ম, সুরা এবং তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত। আমাদের দেশে তারাবির নামাজের সংখ্যা নিয়ে মতপার্থকের মতই তারাবি নামাজের দোয়া ও মোনাজাত নিয়েও রয়েছে মতানৈক্য।

তাই তারাবি নামাজ পড়ার নিয়ম, নিয়ত, দোয়া ও মোনাজাত তুলে ধরা হলো-

তারাবির নামাজের নিয়ত (আরবিতে ও বাংলায়) বাংলা উচ্চারণসহ

উদ্দেশ্য ও নিয়ত বিহীন কাজ পাল বিহীন নৌকার মত। এছাড়া, একটি হাদিস রয়েছে – ইন্নমাল আ-মালু বিন-নিয়াত। অর্থাৎ আমল নিয়তের উপর নির্ভর করে। ইসলামে নিয়ত হলো আমল বা ইবাদতের একটি শর্ত। তাই নামজ ও রোজাসহ সকল ইবাদতের পূর্বে নিয়তের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে, এই নিয়ত যে শুধু আরবিতেই নির্দিষ্ট কথার মাধ্যমেই করতে হবে এমন বাধকতা নেই। যেহেতু ইসলামের কোরআন ও হাদিসের ভাষা আরবি সেহেতু অনেকেই আরবিতে নিয়ত করতে সাচ্ছন্দবোধ করেন এবং এটাকে উত্তম পন্থা বলে বিবেচনা করে থাকেন। এসবদিক বিবেচনা করে আমার তারাবির নামাজের নিয়ত আরবিতে (বাংলা উচ্চারণসহ) ও বাংলায় এবং এর অর্থ বর্ণনা করছি।

তারাবির নামাজের নিয়ত আরবিতে: نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ للهِ تَعَالَى رَكْعَتَى صَلَوةِ التَّرَاوِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اللهُ اَكْبَرْ

তারাবির নামাজের নিয়ত বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা, রাকাআতাই সালাতিত তারাবি সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তায়ালা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।

তারাবির নামাজের নিয়ত বাংলা অর্থ : আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবি সুন্নত নামাজের নিয়ত করছি; আল্লাহু আকবার।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে খুব কম মানুষই আরবি পড়তে পারে। যেহতু আরবিতে নিয়ত করার বাধ্যবাধকতা নেই এবং ভাষার তারতম্য হেতু উচ্চারণে সমস্য হতে পারে তাই যারা আরবি নিয়তের পরিবর্তে বাংলায় নিযত করাই শ্রেয়। কারণ, যারা আরবি পড়তে পারি না কিংবা উচ্চারণে সমস্যা রযেছে তারা ভুল উচ্চরণ করলে অর্থের তারতম্য হয়ে যেতে পরে। এরফলে, সওয়াব না হয়ে বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে গোনাহ হতে পারে। তাই আমরা বাংলায় তারাবির নিয়ত করতে পারি।

তারাবির নামাজের নিয়ত বাংলায়

হে আল্লাহ, আমি কেবলামূখী হয়ে এই ইমামের পেছনে দুই রাকাত তারাবির সুন্নত নামাজ পড়ছি… আল্লাহু আকবার।

তারাবির নামাজের নিয়ম

তারাবি নামাজ দু’রাকাত দ‘রাকাতে করে আদায় করতে হয়। রমজানে ইশার নামাজ আদায়ের পর হতে সুবহি সাদিকের পূর্বে অর্থাৎ কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ আদয়ের পূর্বেই এই নামাজ আদায় করতে হয়। এই নামাজকেই অনেকে কিয়ামুল লাইল বলে থাকেন। এই নামাজ এককি ও ইমামের পেছনে জামাতবন্দী হয়েও আদায় করা যায়। যদিও জামাতবন্দী হয়ে আদায় করার বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। করাণ, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর জীবদ্দশায় জামাতবন্দী হয়ে তারাবি নামাজ আদায় করেছেন মর্মে হাদিস খুব একটা পাওয়া যায় না। যতটুকু জানা যায়, নবীজির মৃত্যুর পর হযরত উসমান (রা) এর জীবদ্দশায় তিনি প্রথম তারাবি নামাজকে জামাতে আদায়ের নির্দেশ দেন এবং জামাতে তারাবি নামাজ আদায় শুরু হয়।

আমরা যদি তারাবি শব্দের অর্থ বা অনুবাদ দেখি তাতে দেখা যায় যে, আরবি তারাবীহ শব্দটির একবচন ‘তারবীহাতুন’ এর আভিধানিক অর্থ বসা, বিশ্রাম করা, আরাম করা। তাই তারাবি নামাজ দুই রাকাত দুই রাকাত করে চার বা ছয় রাকাত পর বসে একটু বিশ্রাম বা আরাম করা যেতে পারে। কিংবা দুই রাকাত দুই রাকাত করে আদায়ের প্রথা করা হয়েছে যেন কোন মুসল্রির উপর চাপ না পড়ে। আর এই দুই দুই চার রাকাত পর বিশ্রামের সময় কিছু দোয়া বা মুনাজাত পালন করা হয়ে থাকে।

তারাবির নামাজের দোয়া

আমরা জানি তারবি শব্দের আভিধানিক অর্থ বিশ্রাম বা আরাম করা। তাই এই নামাজটি ধীরে ধীরে লম্বা সুরা বা আয়াত দিয়ে এই নামাজ আদায় করতে হয় এবং প্রতি চার রাকাত অন্তর অন্তর একটু বিরতী দিয়ে থাকে। প্রাতি চার রাকাতের পর আমাদের দেশে কিছু দোয় পাঠ ও মুনাজাত করার রেওয়াজ রয়েছে। যদিও তা সহিহ কোনও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় এবং ইসলামি স্কলারস এর মধ্যে

তারাবি নামাজের দোয়া

سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظْمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوْتِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِيْ لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوْتُ اَبَدًا اَبَدَ سُبُّوْحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّنا وَرَبُّ المْلائِكَةِ وَالرُّوْحِ

বাংলা উচ্চারণ : ‘সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা জিল ইয্যাতি ওয়াল আঝমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিব্রিয়ায়ি ওয়াল ঝাবারুতি। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামুত আবাদান আবাদ; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ।’

তারাবির নামাজের মোনাজাত

তারাবি নামাজের মোনাজাত

اَللَهُمَّ اِنَّا نَسْئَالُكَ الْجَنَّةَ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنَ النَّارِ يَا خَالِقَ الْجَنَّةَ وَالنَّارِ- بِرَحْمَتِكَ يَاعَزِيْزُ يَا غَفَّارُ يَا كَرِيْمُ يَا سَتَّارُ يَا رَحِيْمُ يَاجَبَّارُ يَاخَالِقُ يَابَارُّ – اَللَّهُمَّ اَجِرْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ- بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّحِمِيْنَ

বাংলা উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউজুবিকা মিনাননার। ইয়া খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান নার। বিরাহমাতিকা ইয়া আঝিঝু ইয়া গাফফার, ইয়া কারিমু ইয়া সাত্তার, ইয়া রাহিমু ইয়া ঝাব্বার, ইয়া খালিকু ইয়া বার্রু। আল্লাহুম্মা আঝিরনা মিনান নার। ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝির। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।’

তারাবির নামাজ আট রাকাত না বিশ রাকাত

তারাবির নামাজ আট রাকাত না বিশ রাকাত এই নিয়ে রয়েছে হাজরও প্রশ্ন। মতবিরোধ রয়েছে ইসলামি স্কলারসদের মধ্যেও। একদল ইসলামি স্কলার্শ মনে করেন তারাবি নামাজ আট রাকাত আবার অন্যদল ইসলামি স্কলার্শ মনে করেন তারাবির নামাজ বিশ রাকাত।

আমাদের উচিত ইসলামের সকল ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অনুসরণ করা। কখনোই কোনও বিষয়ে একেবারে ছাড় কিংবা কট্টর না হয়ে বেশিরভাগ মুহাদ্দিস বা আলেমদের মতাদর্শ অবলম্বন করা। এক্ষেত্রে, আমরা যাদেরকে অনুসরণ করবো তারা যেন জ্ঞানের দিকে সবথেকে বেশি জানা আলেম হন।

শেষকথা

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) পবিত্র এই রমজান জুড়ে বেশি বেশি তওবা বা এসতেগফার করতেন। যে ইসতেগফারগুলো তিনি জরুরি বলে জীবদ্দশায় সাহাবিদের বলে জানান এবং নিজেও যে দুইটি বেশি বেশি পড়তেন তাহলোঃ

– ১. اَﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇﻧَّﻚَ ﻋَﻔُﻮٌّ ﺗُﺤِﺐُّ اﻟْﻌَﻔْﻮَ ﻓَﺎﻋْﻒُ ﻋَﻨِّﻲ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আ’ন্নি।

২. اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্বতানি; ওয়া আনা আ’বদুকা ওয়া আনা আ’লা আ’হদিকা ওয়া ওয়া’দিকা মাসতাত্বা’তু, আউজুবিকা মিন শাররি মা সানা’তু আবুউলাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়া; ওয়া আবুউ বিজামবি ফাগফিরলি ফা ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।’

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.