ফিতরা কত টাকা ২০২২ | সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ | ফিতরা দেওয়ার নিয়ম

৬,৬২২

সদকাতুল ফিতরা বা ফেতরা কিংবা সদকাতুল যাকাত হলো পবিত্র রমজান বা সিয়ামের একটি আদব যা হিজরী সনের সিয়াম সাধনার মাস রমজানে আদায় করতে হয়। আমরা জানি সদকাতুল ফিতর কি? তাই তো রমজান শুরুর পর থেকেই আমরা জানার চেষ্টা করি ফেতরা বা ফিতরা বা সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ, সদকাতুল ফিতর কাকে দেওয়া যাবে, ফেতরা বা ফিতরা বা সদকাতুল ফিতর কার উপর ওয়াজিব, ফেতরা / ফিতরা বা সদকাতুল ফিতরের গুরুত্ব, ফিতরা কত টাকা ২০২২, সদকাতুল ফিতর কত টাকা ২০২২, sadaqatul fitr 2022, sadaqatul fitr amount 2022. ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ জনপ্রতি ফেতরা বা ফিতরার হার নির্ধরন করে থাক।

সদকাতুল ফিতরা বা ফেতরা অর্থ কি?

শাব্দিক অর্থে সাদাকাতুল ফিতরা বা ফেতরা অর্থ খুঁজলে আমরা দুটি শব্দ সাদাকা ও ফিতরা পাই যেখানে সাদাকাহ অর্থ হলো দান এবং ফিতর শব্দের অর্থ হলো ভঙ্গ করা বা ভাঙ্গা। শাব্দিক অর্থে আমরা দেখতে পাই ভঙ্গের জন্য কোনো দান যাকে সাদাকাতুল ফেতরা ফিতর বলা যায়।

ইসলামের পরিভাষায় ইসলামের ফরজ ইবাদত সিয়াম পালনের সময় অনিচ্ছাকৃত কোনো ভূল-ভ্রান্তি হলে বা কোনো আমল ছুটে গেলে কিংবা কোনো কারণে রোজা ভঙ্গ হলে (যা আমাদের অজানা থাকে) তার কাফ্ফারা স্বরূপ যে দান বা সদকা করা হয়ে থাকে তাকে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা বলা হয়ে থাকে।

আমরা জানি ইসলামের দ্বিতীয় হিজরীতে মুসলিম উম্মাহর জন্য রমজনের সিয়াম পালন ফরজ করা হয়েছে। মহান আল্লাহর নির্দেশে বিশ্ব নবি হযতর মুহাম্মদ (স) তার উম্মদের জন্য এই নির্দেশনা দেন। তৎকালীন সময়ের সাহবিদের মাঝে হঠাৎ করে একটি ফরজ ইবাদত পালনের নির্দেশনা আসায় অনেকেই অজ্ঞতাবশতঃ কিছু ভুল-ভ্রান্তি করে ফেলেছেন। অনিচ্ছাকৃত বা অজ্ঞতা বশতঃ সংঘটিত হওয়া এসব ভুল-ভ্রান্তির কাফ্ফারা হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমান সাদকা করা নির্দেশ প্রদান করা হয় যা ইসলামের ইতিহাসে সাদাকাতুল ফিতর বা সদকায়ে ফিতর বা ফেতর নামে পরিচিত।

কোন লোকের প্রতি ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব

রমজানের সিয়াম পালনে যেহেতু ভুল-ভ্রান্তি হতেই পারে তাই এটি সামর্থবান সকল মুসলিম উম্মাহর জন্য  আদায় করা ওয়াজিব। এখানে ধনী, ছােট, বড়, স্বাধীন, ক্রীতদাস, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপর ওয়াজিব বলা হয়েছে। অর্থাৎ শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা পর্যন্ত জন্ম নেওয়া কোনো বাচ্চার জন্যও এটি আদায় করতে হবে। যারা যাকাত গ্রহণের শর্ত পূরণ করে এমন ব্যক্তি সদাকাতুল ফিতরও গ্রহণ করতে পারে।

নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে মুসলমান নারী-পুরুষের সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ঈদের নামাজে যাওয়ার আগেই ফিতরা আদায় করতে হয়।

ফিতারর মাসলা-মাসায়েল

ফিতরার মাসলা বা মাসায়েল কি? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফের একটি হাদিস না বললেই নয়।

রসুলুল্লাহ (সা:)-এর থেকে হযরত ইবনু ওমর (রা:) বর্ণনা করেন- فرض رسول الله صلى الله عليه و ستم زكاة النظر من رمضان اغا ن تمر أوضاعا بين شعير على العبي والخير والكر والأنثى والصغير والكبير من المشييي.

অর্থ: রসুলুল্লাহ (সা: ) সদাকাতুল ফিতর এক সা’ পরিমাণ খেজুর কিংবা যব প্রত্যেক মুসলিম, ক্রীতদাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী, ছােট ও বড় সকলের উপর অপরিহার্য করেছেন।

বিশ্ব নবীর এই হাদিসটি বিশ্লেষনে মুহাদ্দিসগণ এক বিশাল বর্ণনা দিয়েছেন কিব্জাবে আদায় করতে হবে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা। ফিতরা স্বাধীন কিংবা ক্রীতদাস নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলের জন্য আদায় করতে হবে। তবে, ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ যাদের আয় রোজগার নেই তাদের ফিতরা অভিভাবক হিসেবে যেকেউ আদায় করলেই হবে।

এক্ষেত্রে, ঈদুল ফিতরের সুবহে সাদিকের পূর্বেও যদি কোন শিশু জন্মগ্রহণ করে তারও ফেতরা আদায় করা অভিভাবকের উপর ওয়াজিব। অপরদিকে, ঈদুল ফিতরের সুবহে সাদিকের পূর্বে কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার হয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হবে না।

ফিতরা আদায়ের বাধ্যবাধকতা নিয়েও বিশ্ব নবীর বেশ কিছু হাদিস। এক্ষেত্রে নিচের হাদিসটি উল্লেখযোগ্য।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন- قرض رسول الله زكاة الفطر ظهره للصائم من الفرو الرق وطعمه المساكين

অর্থ : রসুলুল্লাহ (সা:) ফিতরার যাকাত সাওম পালনকারীকে অনর্থক, অবাঞ্ছনীয় ও নির্লজ্জতামূলক কথাবার্তা বা কাজকর্মের মলিনতা থেকে পবিত্র করা এবং মিসকিনদের উত্তম খাদ্যের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে অত্যাবশ্যকীয় করেছেন। (সুনানু আবি দাউদ)

মূলত, ইসলাম যে সমতা সমর্থন করে এবং সমাজে ধনী গরিবের ব্যবধান কমিয়ে সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধনে বিশ্বাসী সে বিষয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য এই ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়েছে। ঈদের দিন সামর্থবানদের পাশাপাশি হত-দরিদ্ররাও যেন উন্নত পোশাক পরিধান ও ভাল খাবার খেতে পারে তাই

ফিতরা ২০২২ ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ফিতরার মাসল-মাসায়েল সংক্রান্ত সবথেকে জনপ্রিয় হাদিস যা সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত এবং হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত ইবনু ওমর (রা:) হতে বর্ণিত। হদিসটিতে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন ফিতরা হবে এক সা পরিমান খেজুর বা যব। এছাড়া, অন্যান্য হাদিস মারফত আমরা জানা যায় যে, প্রিয় নবী (স.) ও তার সাহাবিগণ তাদের জীবদ্দশায় খেজুর, যব, গম বা আটা, পনির ইত্যাদি দ্বারা পালন করতেন।

ইসলামি স্কলার্শগণও পরবর্তী সময়ে এইসকল খাদ্য দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করতেন এবং নির্দেশ দিতেন। তবে, সময়ের সাথে সাথে মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মুহাদ্দিসগণ ঐ সকল দ্রব্যের ওজনের সমপরিমান অর্থ বা টাকায় ফিতরা আদায়ের সম্মতি দেন।

যেহেতু, সময়ের সাথে সাথে খাদ্যদ্রব্যের দামের উঠানাম বা হ্রাস-বৃদ্ধি হয় তাই ফিতরার হার অর্থে বা টাকায়ও বছর বছর উঠা-নামা করে।

বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফেতরার হার নির্ধারন করে থাকে। এবিষয়ে রয়েছে জাতীয় ফিতরা নির্ধারণ কমিটি। এই কমিটি প্রতি বছর রমজান শুরুর পর বাজার বিশ্লেষন করে রমজনের প্রথম সপ্তাহে কোন বছর সাদকাতুল ফেতরা কত হবে তা নির্ধারন করে থাকে। যেহেতু, ২০২২ সালের রমাদান ৩ এপ্রিল ২০২২ তারিখে শুরু হয়েছে তাই উক্ত কমিটি ৯ এপ্রিল ২০২২ তারিখে সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ বা ফিতরা কত টাকা ২০২২ সালে তা নির্ধারন করে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

শনিবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সভায় ২০২২ সালের ফিতরা জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২৩১০, সর্বনিম্ন ৭৫ টাকা নির্ধরন করে। কমিটি দেশের বিভিন্ন বড় বড় জেলা শহর ও বিভাগ হতে গম, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর ও পনিরের বাজার মূল্য সংগ্রহ করতঃ তার উপর ভিত্তি করে ফিতরা ২০২২ নির্ধারণ করেছে।

এক সা পরিমাণ কত কেজি

হাদিসের বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই ফেতরা আদয়ে বেশ কিছু  খাদ্যদ্রব্যের বর্ণনা রয়েছে। যেমন- গম, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির ইত্যাদি। একই সাথে পণ্যের পরিমাণেও তারতম্য দেখা যায়। যেমন খেজুর,দিতে হবে এক সা’ আবার গম, যব, পনির কিংবা কিসমিসের ক্ষেত্রে বলা হয়ে দু্ই সা’।

এক সা বলতে তৎকালীন সময়ে আরবে পরিমাপের একককে বুঝানো হয়েছে যা বর্তমান পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রতি সা হলো এক কেজি ৬৫০ গ্রাম। অন্যদিকে দুই সা হলো তিন কেজি ৩৩০ গ্রাম।

ফিতরা কি দিয়ে বা দ্বারা আদায় করতে হবে

আমরা যদি বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবদ্দশায় ও সাহবিগণদের বর্ণিত সহিহ হাদিসগুলো দেখি তহলে দেখতে পাই নবিজী (স.) ও তার প্রিয় সাহবীগণ গম, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির ইত্যাদি পণ্যগুলোর যেকোনো একটির দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন। এক্ষেত্রে, যে যার সামর্থানুযায়ী যেকোনো একটি পণ্যের নির্ধারিত পরিমান দান করার মাধ্যমে তা আদায় করবে।

এক্ষেত্রে ভালো মানের গম কিংবা আটা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চাইলে দিতে হবে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম কিংবা এর বাজার মূল্য ৭৫ টাকা।

যব দিয়ে আদায় করতে চাইলে একজনকে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৩০০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হবে।

অন্যদিকে, কেউ যদি কিশমিশ দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চায় সেক্ষেত্রে একজনকে দিতে হবে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১হাজার ৪২০ টাকা।

অপরদিকে, খেজুর দিয়ে দিতে চাইলে তা হবে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ৬৫০ টাকা।

আর, পনির দিয়ে করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২ হাজার ৩১০ টাকা ফিতরা দিতে হবে।

 

ফিতরা কি টাকা দিয়ে আদায় হবে

অনেকেই বলে থাকেন যে, যেহেতু হাদিসে গম, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির ইত্যাদি পণ্যগুলোর যেকোনো একটির দ্বারা ফিতরা আদায়ের কথা বলা আছে সেহেতু টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েজ হবে না।

তবে, বিষয়টিকে আনেক ইমাম ও মুহাদ্দিসগণ ভিত্তিহীন বলেছেন এইজন্য যে, যেসকল হাদিস বলছে যে গম, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির ইত্যাদি পণ্যগুলোর যেকোনো একটির দ্বারা ফিতরা আদায় করতে হবে সেখানে উল্লেখ নেই যে তা টাকা দিয়ে আদায় হবে না।

সর্বশেষ মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলার নিকট প্রার্থনা আল্লাহ আমাদেরকে ফেৎনা সৃষ্টি না করে সঠিক দ্বীন বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.