ভেষজ এন্টিবায়োটিক বা প্রাকৃতিক এন্টিবায়োটিক

0 ৩১৮

আমাদের জীবন যাপন পদ্ধতিতে নানা কারনেই আমরা আমাদের দেহের জন্য ভালো নয় এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকি। এসব আক্রমণ হতে বাঁচতে  বতর্মান সময়ে আমরা পুরোটাই অ্যান্টিবায়োটিকের উপর নির্ভরশীল। এটি আমাদের সংক্রমনের হাত থেকে উপশম দিলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়ে যায় আমাদের শরীরে। নিজেদের এসব পর্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন প্রাকৃতিক এন্টিবায়োটিক বা হারবাল এন্টিবায়োটিক বা ভেষজ এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা। আয়ুর্বেদ ও ইউনানিশাস্ত্র মতে, আমাদের প্রকৃতিতে রয়েছে হাজারো উপাদান যা এসব ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস মেরে ফেলতে সক্ষম। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলার পাশাপাশি এসব উপাদানের রয়েছে স্বাস্থ্যকর অনেক দিক। এগুলো সারাবছর খেলে বাড়বে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আর কাজ করবে রোগ নিরাময়ে। অসুন দেখে নেয়া যাক প্রাকৃতিক ভেষজ যা অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে।

ভেষজ / প্রাকৃতিক / হারবাল এন্টিবায়োটিক তৈরির নিয়ম

সংক্রামক রোগ হতে নিজেকে রক্ষা করতে বা ঋতু পরিবর্তনকালীন সময়ের কিছু রোগ হবে বাঁচতে ঘরেই তৈরি করে ফেলতে পারেন ভেষজ অ্যান্টিবায়োটিক। যার জন্য প্রথমেই দরকারি উপদানগুলো সংগ্রহ করে নিতে হবে।

দরকারি উপদানগুলোঃ রসুন -১০০ গ্রাম; অর্গ্যানিক লেবু ৫টি; আদা ৭০ গ্রাম; কাঁচা হলুদ ৭০ গ্রাম ও এক চিমটি কালো গোল মরিচ।

রসুন, লেবু, আদা ও হলুদ ভালোকরে ধুয়ে ছোট ছোট টুকরো করে নিতে হবে। ছোট এই টুকরোগুলো ১ লিটার পানিতে ব্লেন্ড করে নিতে হবে। উক্ত মিশ্রনের সাথে গোল মরিচের গুড়ো মিশিয়ে হালকা আঁচে গরম করে ২০ মিনিট ঢেকে রাখতে হবে।

ঠান্ডা হলে মিশ্রনটি ছেকে কাঁচের বোতলো ঢেলে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে। শীতের সময় উক্ত মিশ্রন হতে প্রতিদিন আধা কাপ করে সেবনে ঋতু পরিবর্তনকালীন সময়ের রোগ হতে বাঁচা সম্ভব। এছাড়া, প্রয়োজনে একই মাত্রায় তিনবেলা সেবন করতে হবে। তবে, ২ থেকে ৫ বছরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ২ চামচ দুইবার দেয়া যেতে পারে।

রসুনের উপকারিতা

এন্টিভাইরাল ও এন্টিফাঙ্গালের উপস্থিতি সমৃদ্ধ এই খাবারটি চীনসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে মশলা পণ্য হিসেবে সমাদৃত হয়ে থাকলেও ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক জার্নালে বলা হয়ে রসুনে থাকা এলিসিন নামক উপাদান প্রাকৃতিক এন্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে।

হলুদের উপকারিতা

এটিও আমাদের দেশে মশলা গোত্রের একটি উপাদান হলেও আয়ুর্বেদ ও প্রাচীন চৈনিক চিকিৎসকগণ এটিকে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। হলুদে উপস্থিত এন্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান দেহে সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ করার পাশাপাশি এর আন্টি-অক্সাইড সাদা রক্ত কনিকাকে বাঁচিয়ে রাখে। হলুদে থাকা কারকিউমিন দেহের হরমোনের সমন্বয় করত তা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করে। স্ট্রেস বা হাতাশা কমাতে সাহায্য করে মস্তিষ্কে তথ্যের আদান-প্রদান বাড়াতে বিশেষ ভুমিকা রাখে।

আদার উপকারিতা

আদা বহুদিন থেকেই রোগ প্রতিরোধ ও রোগ নিরাময়ে ব্যবহার হয়ে আসছে। আদাতে প্রচুর পরিমানে খনিজ উপাদানের পাশাপাশি জিঞ্জোরেল, শোগাওল, জিঞ্জেরন এবং টার্পেনোডিস-এর মত একটিভ ইনগ্রিডিয়েন্ট রয়েছে। এসব উপাদান রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।

লেবুর উপকারিতা

ছোট্ট ফলটি কম বেশি সবাই খেয়ে থাকি। এটি দেহের পিএইচ মাত্রার সমন্বয় করে। শরীর হতে খারাপ কোলেস্টেরল বা চর্বি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া, ভেতরে ও বাইরের ক্ষত সারাতে এর ভুমিকা অনেক বেশি।

জ্বর, সর্দি বা কাশি নিরাময়ে যেসব ভেষজ কাজ করে

জ্বর, সর্দি, কাশি কিংবা মাথা বা গলা ব্যাথাসহ ঋতু পরিবর্তনহেতু কিছু সাধারণত সংক্রামন রোগের প্রভাব যুগ যুগ ধরেই রয়েছে। এসব রোগ হতে বাঁচতে ও সংক্রমন হতে নিজেকে রক্ষা করতে রয়েছে কিছু ভেষজ। ঔষধি এসব গাছের ব্যবহার জানলে ঘরেই তৈরি করা অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে খুব সহজেই উপশম পাওয়া সম্ভব।

তুলসী পাতার উপকারিতা

এক ধরনের অ্যালকালয়েড বা উপক্ষার সমৃদ্ধ তুলসীপাতা সাধারণ জ্বর ও সর্দি-কাশি নিরাময়ে বিশেষভাবে কাজ করে থাকে। এতে আরো রয়েছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিবায়োটিক উপাদান। এছাড়া, গলা ব্যথা, ব্রঙ্কাইটিস, ম্যালেরিয়াসহ আরো অনেক রোগের উপশমক হিসেবে কাজ করে তুলসী পাতার রস।

ব্যবহার

১০-১২ টি তাজা পাতা ভালো করে ধুয়ে পাতাগুলো অল্প আঁচে কিছুক্ষণ ফোটাতে হবে। ফোটানে পানি প্রতিদিন সেবন করতে হবে। এছাড়া, সামন্য ঘি দিয়ে তুলসী পাতা ভেজে খেলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে।

বাসক পাতার উপকারিতা

আদিকাল থেকেই রয়েছে বাসক পাতার ঔষধি ব্যবহার যা আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারাও প্রমানিত। শুকনো কাশি, শসনতন্ত্রে জমে থাকা কফ বের করে আনা কিংবা কাশির সাথে রক্তপাত নিরাময়ে বাসক পাতার রস বা ফোটানো পানি বিশেষ উপকারী। ফুসফুসের সমস্যায়ও এর ব্যবহার হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়া, পানি জীবানু মুক্ত করতে বা কলো চামড়া উজ্জ্বল করতেও বাসক পাতার ব্যবহার হয়ে থাকে।

ব্যবহার

বাসক পাতার রস সম-পরিমাণ মধুর সাথে খাওয়ালে শিশুর সর্দি-কাশির উপশম হয়। বাসক পাতার রস গোসলের পূর্বে মাথায় দিলে উকুনের মতো পরজীবি নাশক এবং ফোড়ায় ঘা-পাঁচড়ায় পাতার প্রলেপ ব্যথা নাশক হিসেবে  কাজ করে।

চিরতার উপকারিতা

চিরতার রয়েছে বহুবিধ ঔষধি গুণ। সংক্রামক অসুখ বিসুখে প্রতিরোধী ভূমিকা পালন করে চিরতা। তিক্ত স্বাদের এই ঔষধি গাছটি হৃদপিণ্ড ও যকৃতে শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি বর্ধক হিসেবে কাজ করে। সকল ধরনের জ্বর প্রতিরোধে বিশেষ ধরনের কাজ করে থাকে।

ব্যবহার

ঔষধি গাছ চিরতার কান্ড, ডাল এবং পাতা ভালো করে ধুয়ে বিশুদ্ধ পানিতে ১০-১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে খালি পেটে ঐ পানি পান করতে হয়। নিয়মিত সেবনে সাধারণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি চেহারায় বার্ধক্যজনিত চাপ কমায়। ব্রণ ও খোঁস পাঁচড়ায় বিরুদ্ধেও কাজ করে। এছাড়া, কৃমির উপদ্রবে ও চুলাকনির সমস্যায় বেশ কার্যকর।

তেলাকুচা পাতার উপকারিতা

এন্টিহিস্টামিন ও ‘মাস্ট সেল স্টেবিলাইজিং’ সমৃদ্ধ একটি জনপ্রিয় ভেষজ যা কোথাও কোথাও ‘কুচিলা’, তেলা, তেলাকচু, তেলাহচি, তেলাচোরা কেলাকচু, তেলাকুচা বিম্বী ইত্যাদি নামে পরিচিত। তেলাকুচার পাতা, লতা, মূল ও ফল সবই ব্যবহৃত হয়। কুষ্ঠ, জ্বর, ডায়াবেটিস, হাঁপানি ও ব্রংকাইটিস ইত্যাদি রোগে তেলাকুচা উপকারিতা রয়েছে। তেলাকুচায় অধিক পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন থাকায় এই ভেষজ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

পেটের পীড়া নিরাময়ে যেসব ভেষজ কাজ করে

অনেকেই পেটের দীর্ঘমেয়াদী পীড়ায় ভোগেন যা মুলতঃ খাবার কিংবা পানি দ্বারা হয়ে থাকে। এছাড়া ভেজাল বা অনিরাপদ খাবার গ্রহণও অন্যতম একটি কারণ। পেটের এসব নানাবিধ সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার। এর তালিকায় রয়েছে থানকুনি পাতা, মেন্দা পাতা, বন জুঁই বা ভাট ফুল ও লজ্জাবতি।

থানকুনি পাতার উপকারিতা

কয়েন আকৃতির ছোট ছোট পাতা থানকুনিতে রয়েছে বহু রোগের উপশম। খাদ্য হিসেবে সরাসরি গ্রহণ করার পাশাপাশি চায়ে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া, পাতা ও কান্ডের নির্যাসও সেবন ও পাতা রান্নায় ব্যবহার করা যায়। নিয়মিত খেলে হজমের সমস্যা ও পেতে গ্যাসের সমস্যা নিরসন হয়। তারুণ্য ধরে রাখতে এই পাতার তুলনা হয় না। ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও এর জুড়ি নেই।  এর পাশাপাশি আলসার এগজিমা, হাঁপানি, চুলকানি ও অন্যান্য চর্মরোগ সারাতে থানকুনি পাতার ব্যবহার আদিকাল হতে।

লজ্জাবতি গাছের উপকারিতা

ভেষজ গাছ লজ্জাবতির রয়েছে অনেক ওষধি গুন। পাতা, কান্ড, শেকড় সবকিছুই ব্যবহার্য্য। রক্ত আমাশয় বা ডায়রিয়ায় লজ্জাবতির শেকড় গুড়ো করে সেব্য। এর পাতার পেস্ট বিভিন্ন ধরনের ঘা বা পাঁচড়ায় উপকারি। বাতজ্বর বা হাত পা জ্বালা-পোড়ায়ও লজ্জাবতীর উপকারিতা রয়েছে।

মেন্দা পাতার উপকারিতা

ওষধি গুনে ভরপুর মেন্দা পাতায় রয়েছে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষমতা। মেন্দা পাতার নির্যাস বা রস পেট ফাঁপা, বদহজম কিংবা রক্ত আমাশয় নিরাময়ে কাজ করে থাকে। পাতার পাশাপাশি এই গাছের ছাল বা বাকলেরও উপকারিতা রয়েছে। হাড় ভাঙ্গায় এই গাছের বাকল বেটে ব্যথায় প্রলেফ বা প্লাস্টার দেওয়ার ব্যবহার আদিকাল হতে।

ভাট ফুল গাছের উপকারিতা

বন জুঁই বা ভাট ফুল গাছের পাতা ও ফুলের রয়েছে বহু ভেষজ উপকারিতা। এই গাছের পাতার নির্যাস কাঁচা হলুদের সাথে মিশিয়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া, পাতার বড়ি খালি পেটে কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে। চর্ম রোগ বা অ্যালার্জির সমস্যায় এই গাছের ফুলের ব্যবহার সুপ্রাচীন কাল হতে।

রক্তক্ষরণ বন্ধে ভেষজ

কাটা-ছেঁড়া বা দুর্ঘটনাজনিত রক্তক্ষরণ বন্ধের উপায় হিসেবেও ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার আদিকাল থেকেই। আমাদের দেশের পথে-প্রান্তরে অযত্ন আর অবহেলায় পরে থাকা দূর্বাঘাস, রিফিউজি লতা ইত্যাদির ব্যবহার করে আঘাত জনিত কাটা-ছেঁড়া বা দুর্ঘটনাজনিত রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়ে থাকে।

রূপচর্চায় ভেষজ

কাজের চাপ, স্ট্রেস-এর পাশাপাশি (বসন্তকালে) পরিবেশের ধুলোবালি আর শীতের রুক্ষতায় ত্বক যেন হয়ে উঠে নাজেহাল। এই অবস্থা হতে মুক্তি পেতে আমরা ফেস ওয়াশ, সবান কিংবা অন্যান্য প্রসাধনীর উপর নির্ভরশীল যার বেশিরভাগই বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকারক উপাদান দিয়ে তৈরি। এছাড়া, দীর্ঘদিন ব্যবহারে ত্বক তার স্বকীয়তা হারায়। এর সমাধানে অবশ্য প্রাচীনকাল হতেই রূপচর্চায় ভেষজ-এর ব্যবহার হয়ে আসছে।

ফেনাযুক্ত সাবান বা ক্লিনজ়ার ব্যবহারে সংবেদনশীল আপনার ত্বক রুক্ষ বা খসখসে হয়ে উঠতে পারে। ত্বকের রুক্ষভাব দূর করতে কলা, ড্রাগন ফলের শাঁস ও টক দই চটকে তৈরি প্যাক মুখে লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। ফিরে আসবে ত্বকের ঝিল্লী।

চুলের যত্নে কেশরাজ বা কালোকেশী’র উপকারিতা

কেশরাজ বা কালোকেশী যুগ যুগ ধরে চুলের যত্নে ব্যবহার হয়ে আসছে। এটি চুলের রুক্ষভাব দূর করার সাথে সাথে চুলের পুষ্টির যোগাতে সাহায্য করে এবং চুল পড়া বন্ধ করে। বৈজ্ঞানিকভাবে কেশরাজ বা কালোকেশী ছত্রাকরোধী বা অ্যান্টিফাঙ্গাল প্রমানিত তাই খুশকিতে উপকার পাওয়া যায়।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.