রোজার স্বাস্থ্যগত বা শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

1 ৩২২

রোজা ইসলাম বা মুসলমানদের একটি ধর্মীয় বিধান। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ কালেমা ও নামাজের পরপরই পালনীয় একটি ইবাদত। সিয়াম বা রোজা হিজরি সনের দশম মাস রমজান-এ পালিত হয়। সারাবিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান দীর্ঘ একমাস মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সুবহে সাদিক হতে। সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহারসহ যাবতীয় খারাপ কাজ হতে নিজেকে বিরত রাখে। আর এর জন্য রয়েছে মহান সেই সত্তার নিকট হতে এক মহিমান্বিত পুরষ্কার। ধর্মীয় দিক হয়ে থাকা এমন ইবাদত রোজার স্বাস্থ্যগত বা শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা রয়েছে অনেক। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণায় জানতে পারে যে, রোজা হলো শারীরিক সুস্থতার একটি কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।

রোজার স্বাস্থ্যগত বা শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

কি ঘটছে আপনার শরীরযন্ত্রে

বিশ্বের অনেক দেশেই এ বছর রোজা পড়েছে গ্রীষ্মকালে, ফলে উক্ত অঞ্চলের মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষগুলোকে প্রায় ১৪ থেকে কোথাও কোথাও ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত উপোষ থাকতে হচ্ছে। কি ঘটছে আপনার শরীরযন্ত্রে, এত সময় ধরে পানাহার বা উপোষ করার ফলে। হ্যাঁ, বিজ্ঞানীরা এখন জানতে পেরেছেন এত সময় ধরে না খেয়ে থাকার ফলে আসলে কি প্রভাব ফেলে।

গবেষণায় জানা ফলাফল মূলত দীর্ঘদিন রোজা রাখা বা উপোষ করা মানুষদের উপর চালানো গবেষণালব্ধ ফল। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের পাশাপাশি আনেকেই দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় উপোষ করে থাকেন। তবে, শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই একটানা ৩০/২৯ দিনের দীর্ঘ একটা সময় রোজা পালন করে আসছেন। গবেষণার সুবিধার্থে এই সময়টিকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে।

প্রথম ধাপঃ ১-৫ দিন পর্যন্ত

এই সময়টা খুবই কষ্টকর একটি সময়। কারণ, আপনার শরীরযন্ত্রটি দীর্ঘদিন ধরে এক নিয়মে চলে এসে হঠাৎ করে নতুন একটি নিয়মে নিজেকে মানিয়ে নিতে গিয়ে এই কষ্টকর অনুভুতিতে পড়ে। যদিও একবার খাবার গ্রহণের অন্তত ৮ ঘণ্টা পার না হলে আপনার শরীরযন্ত্র বুঝতে সক্ষম হয় না যে আপনি উপোষ করছেন কিনা। এই সময়ে আপনার শরীরে রোজার কোনো প্রভাব পড়ে না।

আমাদের গ্রহ্ন করা কোনো খাবার পাকস্থলী তার কার্যক্রম করতঃ গ্রহণকরা ঐ খাবারটির পুষ্টিগুণ শরীরকে দিতে সময় নেয় ৮ ঘণ্টা। খাবার গ্রহণের ৮ ঘণ্টা পর হতে যখন পাকস্থলীতে থাকা সহ খাবার হজম হয়ে যায়, তখন মানব শরীরের যকৃৎ ও মাংশপেশীতে সঞ্চিত গ্লুকোজ বা ফ্যাট ভেঙে শরীর তার প্রয়োজনীয় শক্তির চাহিদা পূরণ করে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের সঞ্চিত ফ্যাট বা শর্করা ভাঙ্গার মাধ্যমে মূলত শরীরের ওজন কমতে শুরু করে। ফলে আমাদের শরীরের (খারাপ) কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতে থাকে।

তবে, যেহেতু হঠাৎ করে শরীর তার জমানো শর্করা বা ফ্যাট ভেঙে শরীরের ঘটতি পূরণের চেষ্টা করছে সেহেতু শরীর খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে ঝিমুনি, মাথা ব্যাথা, বমি বমি ভাব কিংবা মাথা ঘোরানোসহ বেশ কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই সময়টাতেই সবথেকে বেশি কষ্ট লাগে।

দ্বিতীয় ধাপঃ ৫-৮ দিন পর্যন্ত

কষ্টকর একটি ধাপ পার হওয়া বা শরীর কিছুটা মেনে নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে আপনার শরীর। তবে, শরীর মেনে নেওয়ার এই পর্যায়ে আপনাকে বেশ কয়েকটি দিকে নজর দিতে হবে। তারমধ্যে অন্যতম হলো, শরীরের পানিশূন্যতা।

এই ধাপে একজন রোজাদারকে খেয়াল রাখতে হবে যেন তার শরীরের প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটে। অভ্যস্ত হওয়ার এই পর্যায়ে আপনার শরীর তার প্রয়োজনীয় শক্তি জমানো চর্বি গলিয়ে রক্তে শর্করা হিসেবে পাঠায়। এই ঘটতি পূরণে আপনাকে অবশ্যই চাহিদার থেকে একটুখানি বেশি পানি শরীরীকে দিতে হবে। অন্যথায় শরীরের পানিশূন্যতার জন্য পারিপার্শ্বিক কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই, ঘাম হয় এমন পরিবেশে থাকলে কিংবা যে কাজে ঘামানোর সম্ভাবনা এমন কাজ হতে যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে।

তবে, খেয়াল রাখতে হবে ইফতার ও ইফতার পরবর্তী সময়ে সে চাহিদা পূরণে যথাসম্ভব শক্তিদায়ক ও রসালো খাবার গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেট, শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাবারকে প্রাধান্য দিতে হবে। অন্যদিকে, পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে যে খাবারগুলোতে সকল পুষ্টির উপস্থিতি (প্রোটিন বা আমিষ, লবণ ও পানি) আছে এমন খাবার তালিকায় রাখা শ্রেয়।

ইফতার ও ইফতার পরবর্তী সময় পানি গ্রহণের ক্ষেত্রে একবারে বেশি পানি না নিয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবারে তা নেওয়া ভালো। এছাড়া, ফলের ক্ষেত্রে তা জুস করে নেয়া যেতে পারে। এছাড়া ‘ডিটক্স ওয়াটার’ তৈরি করে তা অল্প অল্প করে গ্রহণ করতে পারেন। ‘ডিটক্স ওয়াটার’ আপনার শরীরের ঝিমিয়ে পড়া ভাব দূর করে শরীর ও মনকে চনমনে করে তুলতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি হজমের সমস্যা ও পেট ফাঁপা রোধে কার্যকরী ভুমিকা রাখবে।

তৃতীয় ধাপঃ ৮-১৫ দিন পর্যন্ত

রোজার সাথে অভ্যস্ত একটি শরীর আপনার। এই সময় দিনের বেলায় আপনার খাবারের একদমই থাকবে না। পানির পিপাসাও কমে যাবে। কারণ, পুরো প্রক্রিয়ার সাথে মানিয়ে নিয়েছে আপনার শরীর। আপনার শরীর ও মনে ভালোলাগা একটা আবহ তৈরি হবে। এই পর্যায়ের রয়েছে বেশ কিছু সুবিধা।

কারণ, আমরা সাধারণত সবসময় যে ক্যালরিযুক্ত খাবারগুলো খাই তার ফলে শরীর তার নিজস্ব অনেক কাজ করতে পারে না। যেমন- শরীর বা আমাদের কোষগুলো নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারে না, রোজা‍য় উপোষ করার ফলে শরীর ও কোষগুলো তার নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এইসময় শরীর ও কোষগুলো নিজেদের ক্ষত সারিয়ে তোলে যা সংক্রমণ রোধে কার্যকরী ভুমিকা পালন করে বলে জানান ডা রাজিন মাহরুপ -কনসালটেন্ট এডেনব্রুক্স হাসপাতাল।

চতুর্থ ধাপঃ ১৬-৩০ দিন পর্যন্ত

চতুর্থ ধাপ বা শেষের এই দিনগুলোতে আপনার শরীর হয় খুব হলকা ও ঝরঝরে আর আপনাকে লাগবে ভারমুক্ত। শেষের এই দিকটায় আপনার শরীর পুরোপুরি মানিয়ে নেওয়া একটা শরীর। আপনার শরীরযন্ত্র ও তার প্রধান প্রধান অঙ্গসমূহ একধরনের পরিবর্তনের মধ্যে চলে যাবে। বিশেষকরে যকৃৎ, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্র তার মধ্যে থাকা দূষিতগুলো বের করে দেবে।

এর ফলে আপনার অঙ্গ-পত্যঙ্গগুলো ফিরে পাবে পূর্ণ কাজ করার ক্ষমতা। শরীর পাবে পুরো শক্তি, বৃদ্ধি পাবে স্মৃতিশক্তি এবং মনোযোগের উন্নতি হবে বলে জানান ডা রাজিন মাহরুফ

তবে, যেহেতু সারাদিন না খেয়ে থাকছেন এবং শরীর তার চাহিদা মেটাতে মাংসপেশির সঞ্চিত ফ্যাট বা শর্করা নিয়ে নিচ্ছে তাই রোজা ভাঙার পর সেই চাহিদা পূরণে শরীরযন্ত্রকে প্রয়োজনীয় আমিষ ও তরল দিতে হবে। অন্যথায়, শরীরে মাংশপেশিতে তার প্রভাব পড়বে এবং শরীর আপনার মাংসপেশি ভাঙ্গা শুরু করবে।

তবে, রোজা রাখা কি মানুষের জন্য ভালো?

হ্যাঁ, গবেষকগণ তাই বলে। তবে তা কখনই একটানা বেশিদিনের জন্য নয়। কারণ একটানা রোজা রাখার ফলে শরীর প্রথম দিকে তার জমানো চর্বি গলিয়ে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করলেও একটা সময় তা বন্ধ করে দেবে। আর তখন সে তার শক্তির জন্য মাংসপেশীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। আর এটা হবে অবশ্যই ঝুঁকির।

রোজা রাখা অবশ্যই ভালো, শুধু আমরা কি খাই এবং কখন খাই সে দিকে নজর দিলেই হবে। তবে, রোজার একমাস উপোষ করার পর মাঝে মধ্যে রোজা রাখা যেতে পারে এবং তা হবে হাইড্রো ডায়েট বা ওয়াটার ফাস্টিং। এছাড়া, দীর্ঘ সময় বিরতিতে কয়েক দিনের জন্য রোজা রাখা অবশয়ই শরীরের জন্য ভালো।

 

1 Comment
  1. Mdmohiuddin says

    ভালো

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.